রবিবার ১৯ জুলাই ২০২৬ - ১০:৪১
আরবাঈন ও জিহাদের ময়দান—দুটি পরস্পর-পরিপূরক ফ্রন্ট

ইরানের প্রখ্যাত আলেম হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আলীরেজা পানাহিয়ান বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আরবাঈনের পদযাত্রায় অংশগ্রহণ এবং ইসলামী বিপ্লব ও প্রতিরোধের ময়দানে সক্রিয় থাকার মধ্যে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা উচিত নয়। এ বছরের মূল কৌশল হওয়া উচিত—আরবাঈন ও জিহাদের ময়দান—উভয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়া। কারণ, আরবাঈন শুধু একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়; এটি প্রতিরোধ ফ্রন্টকে শক্তিশালী করা, জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা এবং শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধের দাবিকে জাগ্রত রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এ বছরের আরবাঈনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ঈমানদার ও বিপ্লবী শক্তির করণীয় কী। তাঁর ভাষায়, “আরবাঈন এবং বিপ্লবের ময়দান—দুটিকেই একসঙ্গে ধারণ করতে হবে; এ দুটির মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক সম্পর্ক নেই।”

তিনি বলেন, আরবাঈনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সবার জন্য একই সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হতে পারে না। প্রত্যেক ব্যক্তির দায়িত্ব ও পরিস্থিতি ভিন্ন। কেউ কেউ বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন—যেমন মওকিবের সেবাদানকারী, কাফেলা-পরিচালক অথবা ইরাকের জনগণের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ রয়েছে এমন ব্যক্তিরা। আবার অনেকে নিজ নিজ শহর বা এলাকায় বিপ্লবী কার্যক্রম পরিচালনা ও জনপরিসর সক্রিয় রাখার দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁরা যদি নিজেদের দায়িত্ব ছেড়ে চলে যান, তাহলে সেই ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রত্যেকের কর্তব্য তার নিজস্ব দায়িত্ব ও বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়া উচিত।

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন পানাহিয়ান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি এমন নয় যে আরবাঈনে অংশগ্রহণকে সম্পূর্ণভাবে নিরুৎসাহিত করা হবে। আল্লাহর রহমতে দেশের অভ্যন্তরে দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত মানুষ রয়েছেন। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে তাঁর আলোচনার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি জানান, অধিকাংশ এলাকায় অর্ধেকেরও কম মানুষ আরবাঈনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে দেশের অভ্যন্তরের কার্যক্রম শূন্য হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কার কারণ নেই।

তিনি বলেন, কেউ কেউ আরবাঈনকে কেবল একটি মুস্তাহাব জিয়ারত হিসেবে দেখেন এবং মনে করেন, এর জন্য বিপ্লব ও সংগ্রামের ময়দান ছেড়ে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু এ দৃষ্টিভঙ্গি আরবাঈনের প্রকৃত তাৎপর্যকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ। তাঁর মতে, আরবাঈন নিজেই একটি বৈশ্বিক প্রতিরোধের ময়দান। আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ ও সংগ্রামী চেতনার বহু শিক্ষা মুসলিম উম্মাহ আরবাঈনের এই মহাসমাবেশ থেকেই অর্জন করেছে। এটি সভ্যতা নির্মাণের, শহীদ-প্রজন্ম গড়ে তোলার এবং প্রতিরোধ ফ্রন্টকে শক্তিশালী করার এক অনন্য আন্দোলন।

তিনি আইএসআইএল (দায়েশ)-এর বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ইসলামী বিপ্লব এবং ইরান ও ইরাকের শহীদদের আত্মত্যাগ না থাকলে আজ আরবাঈনের এই মহাসমাবেশ সম্ভব হতো না। তাঁর ভাষায়, “আরবাঈন ইসলামী বিপ্লবেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।” দায়েশবিরোধী যুদ্ধের সময় লাখো ইরানি জিয়ারতকারীর উপস্থিতি ইরাকের প্রতিরোধশক্তিকে দৃঢ় করেছিল এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির পরাজয়ে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আজও আরবাঈন প্রতিরোধ ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান শক্তির উৎস।

তিনি বলেন, আরবাঈনকে একটি সাধারণ জিয়ারত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ঈমানদার ও বিপ্লবী শক্তিকে সুসংগঠিত করা এবং নতুন প্রজন্মকে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করার এক কার্যকর মাধ্যম।

আরবাঈনের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তুলে ধরে পানাহিয়ান বলেন, “আরবাঈন হলো ইমাম হুসাইন (আ.)-এর প্রতি বিশ্বব্যাপী এক সম্মিলিত তাওয়াস্সুল। লাখো মানুষের একযোগে তাঁর পবিত্র মাযারের পাশে দোয়া ও মিনতি ব্যক্তিগত ইবাদতের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আজ ইসলামী উম্মাহর ওপর আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ লাভের জন্য এমন সমষ্টিগত তাওয়াস্সুলের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।”

তিনি ইরাকের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, এ বছর ইরাকের জনগণের মধ্যে ইরানের জনগণ এবং শহীদ নেতার প্রতি ভালোবাসা বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ইরাকে ইরানিদের উপস্থিতি একদিকে ইরাকি জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, অন্যদিকে দুই জাতির পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করবে।

তিনি বলেন, এ বছরের আরবাঈনে “ইয়া লিসারাতিল হুসাইন (হুসাইন (আ.)-এর রক্তের প্রতিশোধের আহ্বান)” স্লোগানটি আরও জোরালোভাবে উচ্চারিত হওয়া উচিত। তাঁর মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে “ইয়া লিসারাতিল কায়িদিশ-শাহিদ (শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ)” স্লোগানটি “ইয়া লিসারাতিল হুসাইন”-এর ধারাবাহিকতায় নতুন তাৎপর্য লাভ করেছে। এ কারণেই এ বছরের আরবাঈনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, “আমাদের উচিত আরবাঈনের চেতনাকে নিজেদের শহর-নগরেও ছড়িয়ে দেওয়া।” তিনি উল্লেখ করেন, প্রতি বছর যারা কারবালায় যেতে পারেন না, তাঁদের জন্য বিভিন্ন শহরে ‘জামান্দেগান-এ আরবাঈন’ পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। এ বছর সেই কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত ও কয়েক দিনব্যাপী আয়োজন করা যেতে পারে, যাতে দেশের অভ্যন্তরের জনপরিসরও প্রাণবন্ত থাকে এবং মানুষের সঙ্গে আরবাঈনের আত্মিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়।

তিনি প্রস্তাব করেন, এ বছর যদি প্রত্যেক আরবাঈনযাত্রী অন্তত দুজন নতুন মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেন—যারা আগে কখনো আরবাঈনে অংশ নেননি—তবে এর শিক্ষামূলক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক প্রভাব অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হবে।

তিনি আরও বলেন, যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কারণে আরবাঈনে যেতে পারবেন না এবং দেশের অভ্যন্তরে থেকেই নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁরাও ইনশাআল্লাহ আরবাঈনের সওয়াব লাভ করবেন। যেমন, অনেক সময় মওকিবের খাদেম ও সেবাদানকারীরা সাধারণ জিয়ারতকারীদের চেয়েও অধিক সওয়াবের অধিকারী হন।

সাক্ষাৎকারের শেষে পানাহিয়ান পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, “আরবাঈন এবং সংগ্রামের ময়দান—দুটি পরস্পর-পরিপূরক ফ্রন্ট।” তাঁর আহ্বান, এ বছর যেমন আরবাঈনের মহাসমাবেশকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরের সংগ্রামের ময়দানকেও আরও সক্রিয় রাখতে হবে। যারা দেশে থাকবেন, তারা নতুন মানুষকে সংগ্রামের কাজে সম্পৃক্ত করবেন; আর যারা আরবাঈনে অংশ নেবেন, তারা আরও নতুন মানুষকে এই মহাসমাবেশে নিয়ে যাবেন। এর ফলে যেমন আরবাঈনের মহাসমাবেশ আরও সমৃদ্ধ হবে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ ও জনসম্পৃক্ততাও আরও শক্তিশালী হবে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha